top of page

Bagha Jatin (Bangla Version)

The Bengali version is a translation of the English version with guidance and input from Sri Prithwindra Mukherjee, Padmashree, grandson of Bagha Jatin, a great and worthy scholar in French and English, who has written several works, including Life and Times of Bagha Jatin, and has contributed immensely toward Info-French cultural bonding.  We express our deep reverance and gratitude to the great scholar for his help, active and untiring support, and endeavour for bringing to light the immense contribution of Bagha Jatin to the Indian freedom movement. 

   বাঘা যতীন - ভারতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় 
-শান্তনু দে ও পৃথ্বী
ন্দ্রনাথ মুখার্জী
 
Chapter 4

“আমারে করো তোমার বীণা”

উচ্চ গাঙ্গেয় (উত্তরিপরিভাগে) বিপ্লবের দায়িত্বগ্রহণ করে রাসবিহারী তাঁর কমান্ডার ইন চিফ কে ১৯১৫ সালের জানুয়ারী মাসে তাঁর (রাসবিহারীর) হাতে গড়া সংগঠনটি পরিদর্শনের জন্য ডেকে পাঠান । বাঘা যতীন সপরিবারে এক আধ্যাত্মিক যাত্রার ছলে বারাণসী এসে পৌছলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতুলকৃষ্ণ এবং নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। যতীন বুঝতে পেরেছিলেন যে  রাসবিহারী যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিপ্লব কার্য্য সংগঠিত করতে চান কারণ গদর পার্টির নেতারা অধৈর্য হয়ে পড়েছেন।  তবুও যতীন চেয়েছিলেন যাতে জার্মান অস্ত্র সাহায্য এসে পৌঁছনো পর্যন্ত রাসবিহারী অপেক্ষা করতে পারেন। রাসবিহারীর ২১শে ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের পরিকল্পনা অবশ্য তিনি অনুমোদন করলেন। অতুলকৃষ্ণ এবং নরেন ভট্টাচার্যের মতে রাসবিহারী বসু এই বৃহৎ বৈপ্লবিক প্রচেষ্টার নেতৃত্ব চেয়েছিলেন। তাঁদের মতে এর ফলে বাঘা যতীনের এক যুগ ব্যাপী বিপ্লবের আয়োজন বিফল হয়েছিল। বাঘা যতীন অবশ্য এইসব চিন্তার অনেক ঊর্ধে ছিলেন। তিনি রাসবিহারীর প্ল্যান শুধু অনুমোদনই করেননি, তাকে বাস্তবায়িত করবার জন্য যা অর্থের প্রয়োজন তারও যোগান দিয়েছেন। বিপ্লবের গতিপথ নিজস্ব এবং সে তার প্রয়োজনে নেতা তৈরী করে নেয়। বাঘা যতীন একজন স্বতঃসিদ্ধ বিপ্লবী। তাঁর অনুগামী অমরেন্দ্র তাঁর সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে বলেছেন যে যাঁরা বাঘা যতীনকে  একবার দেখেছেন তাঁরা কেউ ভুলবেননা তাঁর ইস্পাত কঠিন শরীরে অদম্য চরিত্র, ফুলের মতো নরম মন, দুর্জয় আগুনে সাহস, আর দেশমাতৃকার প্রতি অগাধ প্রেম। ডঃ যাদুগোপাল মুখার্জী তাঁর আত্মজীবনীতে যতীন সম্পর্কে লিখছেন যে শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক দিক থেকে যতীন এতটাই উচ্চ অবস্থানে ছিলেন যে যতীনের মতো মানুষ আর তাঁর চোখে পড়েনি। তাঁর অভিমত যে হয়তো মানুষ সম্পূর্ণ সিদ্ধিলাভ করেনা।  কিন্তু যতীন ছিলেন সেইসব মানুষদের অন্যতম যাঁরা সিদ্ধ হওয়ার পথে অগ্রগণ্য। যাদুগোপাল বলেছেন যে তিনি নিজেকেই অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছেন যে তিনি যতীনের সম্পর্কে পক্ষপাতদুষ্ট কিনা। কিন্তু বহু প্রচেষ্টা করেও তিনি যতীনের কোনো দোষ বা খুঁত বার করতে  পারেননি।


নেতাজি গবেষক শুভেন্দু মজুমদার বলেছেন যে সুভাষ চন্দ্র বোস ছিলেন বাঘা যতীন সম্বন্ধে অত্যন্ত শ্রদ্ধাবান। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গ থেকে তিনি বাঘা যতীনের একটিই ত্রুটি পেয়েছিলেন। তা হলো যে বাঘা যতীনের দেশপ্রেম যদিও তুলনাহীন, তাঁর একটিই মহৎ দোষ  ছিল, তিনি তাঁর অনুগামীদের অত্যন্ত বিশ্বাস করেছিলেন। এই বিশ্বাসই  তাঁর কাল হলো।

“মুহূর্তেই অসম্ভব আসে কোথা হতে আপনারে ব্যক্ত করি আপন আলোতে”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে বাংলার বিপ্লবীরা চন্দননগরে একটি গোপন মিটিং-এ অংশ নেন। তাঁদের আলোচ্য বিষয় ছিল বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা। এই মিটিংএ উপস্থিত ছিলেন নরেন ভট্টাচার্য , শ্রীশ ঘোষ, নরেন সেন, মাখন সেন ইত্যাদি কর্তাব্যক্তিরা। স্থির হয় যে অনুশীলন সমিতি দশ হাজার যুবককে বৈপ্লবিক কাজের জন্য প্রশিক্ষণ দেবে এবং বিপ্লবী নেতারা কিছু গোপন সংস্থা তৈরী করবে যাদের মূল উদ্দেশ্য হবে বিপ্লববাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা।  বাঘা যতীন শীঘ্রই এই কর্মযজ্ঞের হোতা হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। এর মধ্যে সব থেকে বড়ো ও ব্যাপক পরিকল্পনা ছিল ১৯১৪ সালের Rodda কোম্পানি-র অস্ত্র লুন্ঠন। শ্রীশ মিত্র বা হাবু মিত্র Rodda কোম্পানিতে কাজ করতেন। তিনি খবর পেলেন যে কোম্পানি ২৬শে অগাস্ট S. S. Tactician নামক জাহাজে দুশো দুইটি বাক্সে অস্ত্র নিয়ে আসছে। শ্রীশ মিত্র এবং আত্মোন্নতি সমিতির শ্রীশ পাল গরুর গাড়িতে করে পঞ্চাশটি মাউসের পিস্তল এবং কার্তুজ নিয়ে পালিয়ে গিয়ে একটি গুদামে সেগুলি লুকিয়ে রাখেন। এই অসম্ভব দুঃসাহসিক কাজে গরুর গাড়ির চালক ছিলেন বিপ্লবী সমাজে মেজদা নামে পরিচিত মুক্তি সংঘের হরিদাস দত্ত। দিনের আলোয় পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে এই কাজ করবার ফলে বাংলায় বিপ্লব একটা বিরাট সাফল্য লাভ করলো। যতীন এই অস্ত্রগুলি সমস্ত আঞ্চলিক নেতৃত্ব বৃন্দের মধ্যে ভাগ করে দেন যাতে তাঁরা স্বদেশী ডাকাতি এবং অত্যাচারী শাসকদের হত্যার কাজ চালাতে পারেন। রাসবিহারীর বিপ্লবের জন্য অর্থের প্রয়োজন। এই অর্থের যোগানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন যতীন। চালু করলেন ট্যাক্সি ক্যাব ডাকাতি। কলকাতা শহরে সবে শুরু হয়েছে ট্যাক্সি। তাতে চড়েই গার্ডেনরিচে জুটমিল লুঠ করলেন বাঘা যতীনের সঙ্গীরা। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এবং চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী বেলিয়াঘাটা অঞ্চলে ডাকাতি করলেন । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হেদুয়াতে গুলি করে একজন পুলিশ অফিসারকে হত্যা করলেন চিত্তপ্রিয়। পাথুরিয়াঘাটাতে একটি নির্জন বাড়িতে যখন বিপ্লবীদের গুপ্ত মিটিং চলছিল, দৈবক্রমে একজন পুলিশের গুপ্তচর সেখানে এসে পড়ে। যতীনকে সে চিনতো। একটুও দ্বিধা না করে যতীন চিত্তপ্রিয়কে বলেন, "শুট !" দুর্ভাগ্যক্রমে সেই চরটি হাসপাতালে কিছুক্ষন বেঁচে ছিল এবং যতীনের নাম পুলিশের কাছে জানিয়ে দেয়। কলকাতা ছাড়া যতীনের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে, কিন্তু তাঁর অনুগামীদের সামনে একই বিপদ এসে পড়ায় তিনি তা করতে পারেননি। নরেন ভট্টাচার্য যতীন এবং ইন্দো জার্মান ষড়যন্ত্রের মধ্যে সেতুস্বরূপ, অতএব তাকে বাঁচাতে হবে। নরেন মুক্ত হওয়ার পরে যতীন তাঁকে অস্ত্র ভর্তি জাহাজের দায়িত্ব নিতে ১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসে বাটাভিয়া পাঠান। Charles Martin নামে দেশ ছাড়লেন নরেন।

“বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছো”

ভারতের বাইরে বহু দিন ধরে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি চলছিল। শ্যামজি কৃষ্ণভার্মা লন্ডনে ইন্ডিয়া হাউসের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ম্যাডাম ভিখাজি কামা এবং শ্যামজি নানাভাবে ভারতীয় ছাত্রদের সাহায্য করতেন, কিন্তু তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই ছাত্রদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তাঁদের ব্রিটিশ বিরোধী কাজে লিপ্ত করবার। লালা লাজপত রাই এবং দাদাভাই নওরোজী এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বিনায়ক দামোদর সাভারকার, একজন মারাঠী দেশপ্রেমী,  এই সংস্থার নেতা ছিলেন। ১৯০৯ সালে তাঁর দেওয়া পিস্তলের আঘাতেই একদিকে অনন্ত লক্ষ্মণ কানহারে নাসিকে দাম্ভিক ম্যাজিস্ট্রেট জ্যাকসনকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, অপরদিকে মদনলাল ধিঙড়া লন্ডনে হত্যা করেছিলেন কার্জন-উইলি কে। মার্সেইলেস বন্দরে পালানোর দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সাভারকারের স্থান হয় সেলুলার জেলে। ইংরেজের কাছে তিনি ছিলেন অন্যতম বিপজ্জনক বিপ্লবী। আরো বেশ কিছু বিপ্লবী ছাত্র লন্ডন হাউসে বিপ্লবের দীক্ষা নিয়েছিলেন এবং প্রথমে প্যারিসে ও পরে যুদ্ধের প্রারম্ভে জার্মানি পালিয়ে যান।  এঁদের মধ্যে ছিলেন লালা হরদয়াল এবং বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় নামে দুই তরুণ।


আমেরিকাতেও গড়ে ওঠে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি পর্ব। স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত আমেরিকায় বিপ্লব কার্যের প্রচলন ঘটান। তাঁকে সাহায্য করেছিলেন তারকনাথ দাস এবং স্বামীজীর ভক্ত মিরন ফেল্প। ফেল্প শ্যামজির সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন এবং তিনি ১৯০৮ সালে ম্যানহাটানে ইন্ডিয়া হাউসের স্থাপনা করেন। এঁরা আন্তর্জাতিক স্তরে  বিপ্লব সংঘঠনগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। বিশেষ করে আইরিশ এবং তুর্কী বিপ্লবীদের সঙ্গে তাঁদের খুবই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আইরিশ বিপ্লবীদের মাধ্যমে ১৯০৮ সালে ভারতবর্ষে S S Moraitis জাহাজে করে অস্ত্র আমদানি করবার একটি পরিকল্পনা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়।


তারকনাথ দাস অনুশীলন সমিতির শুরুর থেকেই এর সভ্য ছিলেন এবং তিনি বাঘা যতীনের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তারক ব্রহ্মচারী নামে সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে তিনি মাদ্রাজে যান এবং সেখান থেকে জাপান হয়ে আমেরিকা রওয়ানা হন। বালগঙ্গাধর তিলকের দূত খানকোজের সঙ্গে মিলে তিনি Indian Independence League স্থাপন করেন এবং Free Hindusthan নাম একটি অগ্নিময়ী পত্রিকা চালাতে থাকেন। যতীন্দ্র তাঁর কিছু সহযোগীকে আমেরিকায় পড়াশোনার জন্য বেশ কিছু টাকা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা তারকনাথ দাসের থেকে অনেক সাহায্য পেয়েছিলেন। লালা হরদয়াল গদর পার্টির সঙ্গে কানাডাতে প্রবাসী গরিব শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করছিলেন। গদর পার্টির বড়ো নেতাদের মধ্যে ছিলেন কর্তার সিং, মহম্মদ বরকতুল্লাহ, বিষ্ণু গনেশ পিংলে, এবং এঁদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রাসবিহারী বসু। প্রবাসী গরিব শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলে তাঁরা চেষ্টা করছিলেন দেশের শিখ ও জাঠ সৈন্য বাহিনীকে বিদ্রোহের দিকে নিয়ে যেতে।

“বিদ্রোহ চারিদিকে”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানি ভারতীয় বিপ্লবী সংগঠনগুলিকে নানাভাবে অর্থ এবং অর্থ সাহায্য দিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের জন্য আহ্বান জানিয়েছিল। জার্মান যুবরাজ যতীনকে এই মর্মে আশ্বাস দেন যে তাঁদেরকে সবরকম অস্ত্র সাহায্য পাঠানো হবে। ১৯১৪ সালে বার্লিন কমিটি বলে একটি সংগঠন তৈরী হয় জার্মানিতে। এর নেতা ছিলেন বীরেন্দ্র চট্টপাধ্যায় যিনি চট্ট নামে  পরিচিত ছিলেন। এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারকনাথ দাস, ডঃ ভূপেন দত্ত, রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ, বরকতুল্লাহ, বিষ্ণু গনেশ পিংলে, লালা  হরদয়াল এবং আরো কিছু বিপ্লবী যুবক। এঁদের সমর্থন করেছিলেন জার্মান সাম্রাজ্যের বৈদেশিক বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের সচিব Max Von Oppenheim  এবং Arthur Zimmermann।  বার্লিন কমিটি নরেন ভট্টাচার্যের মাধ্যমে যতীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছিলেন। চট্ট গদর নেতা সত্যেন সেনের সহায়তায় ১৯১৪ সালে যতীনের কাছে বার্লিন কমিটির কাজের একটি রিপোর্ট পাঠান। কর্তার সিং এবং বিষ্ণু গনেশ পিংলের সঙ্গে সত্যেন কলকাতা আসেন ১৯১৪ সালের ২০ নভেম্বর এবং যতীনের সঙ্গে বেশ কিছু আলোচনা করেন। যতীনের লিখিত নির্দেশ নিয়ে পিংলে এবং কর্তার সিং ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে বেনারস পৌঁছে রাসবিহারীর সঙ্গে দেখা করেন। এঁদের থেকে রাসবিহারী জানতে পারেন যে প্রায় ৪০০০ গদর পার্টির সংগ্রামী যোদ্ধা বজবজ পৌঁছেছেন এবং যতীনের দুই ঘনিষ্ঠ অনুগামী তাঁদের দেখভাল করছেন। এই যোদ্ধারা ভারতের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে যাবেন। রাসবিহারী যতীনের নির্দেশ অনুযায়ী শচীন্দ্র সান্যাল এবং বিষ্ণু গনেশ পিংলেকে অমৃতসর পাঠান।  ১৯১৫ সালে জিতেন লাহিড়ী চট্ট-র আরো খবর নিয়ে আসেন। কোমাগাতামারু জাহাজ কানাডায় স্থান না পেয়ে ভারতে আসে, কিন্তু বজবজে তাদের নামতে না দেওয়া  হলে শিখেরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পুলিশ গুলি চালায় এবং বেশ কিছু শিখ মারা যায়।  এর ফলে শিখেদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়। অতুলকৃষ্ণ এবং সতীশ চক্রবর্তী গদর শিখদের দেখাশোনা করেন এবং তাঁদের সহায়তায় এঁরা উত্তর ভারতের শিবিরে পৌঁছন। প্রায় একদশক ধরে যতীন সৈন্যবাহিনীর মধ্যে বিপ্লব ঘটানোর প্রয়াস চালাচ্ছিলেন। রাসবিহারীকে তিনিই নির্দেশ দেন উত্তর ভারতে সেনাবিদ্রোহের সূচনা ঘটাতে। পিংলে এবং শচীন্দ্রনাথ সান্যালের সাহায্যে এবং গদর পার্টির সহায়তায় রাসবিহারী বিভিন্ন ব্যারাকে সৈন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যাপক বিদ্রোহের প্রস্তুতি নেন। যতীন স্বয়ং দায়িত্ব নিয়েছিলেন পূর্ব ও উত্তর পূর্ব ভারতের। যতীন বাটাভিয়ার সঙ্গে এবং গদর পার্টির নেতারা ব্যাঙ্ককের মূল শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এই ব্যাঙ্ককের শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন তারকনাথের অন্যতম সহযোগী জি ডি কুমার। গদর পার্টির নেতারা ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে দেশপ্রেম এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্য অনুপ্রেরণা প্রচারে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরা পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বৈপ্লবিক সংগঠনগুলির সঙ্গে যোগস্থাপন করেছিলেন এবং চীন ও হংকং ছিল অস্ত্রশস্ত্র আমদানির অন্যতম রাস্তা। চীন ও জাপানের সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন করে তাদের মাধ্যমে অস্ত্র আনবার প্রচেষ্টা হয়েছিল কিন্তু চীন বা জাপান কেউই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়নি, তাই এই রাস্তা শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয়। আমেরিকা, সাংহাই, বাটাভিয়া, ব্যাঙ্কক, ও বার্মার মধ্য দিয়ে অস্ত্র নিয়ে আসবার এক ব্যাপক পরিকল্পনা তৈরী হয়। অ্যানি লারসেন এবং এস এস  হেনরী  নামে  দুটি জাহাজ ভাড়া করা হয় আমেরিকা  থেকে অস্ত্র এনে সেই অস্ত্রগুলিকে এস এস মাভেরিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জাহাজগুলির মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য  বিভিন্ন জাল কোম্পানি এবং তেলের বাণিজ্য ইত্যাদির আবরণের এক বিরাট ধুম্রজালের মাধ্যমে গোপন রাখা হয়।  কিন্তু অস্ত্র পাঠাতে দেরি হওয়ার দরুন এবং চেকদের বিশ্বাসঘাতকতায় এই পরিকল্পনা ধরা পড়ে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ভারতীয় এবং আইরিশ বিপ্লবীদের মধ্যেও তাদের চরদের ঢুকিয়েছিল, যার মাধ্যমে তারা প্রায় সমস্ত প্রথম সারির নেতাদের ধরতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষে এই জাহাজ ধরা পরে যাওয়ার সংবাদ এসে পৌঁছয়নি। তাই ২১ ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের পরিকল্পনা কার্যকরী করবার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।  উত্তর ভারতের অভ্যুত্থানের জন্য প্ররোচনামূলক তথ্য সেনাবাহিনীর মধ্যে বিতরণ করা হলেও, সর্ষের মধ্যে ভূত অর্থাৎ পুলিশের গুপ্তচরদের মাধ্যমে সমস্ত পরিকল্পনা ব্রিটিশ সরকার জানতে পারলো। সিঙ্গাপুরেও বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয়। স্থির হয় যে পাঞ্জাবে ২৩ নম্বর অশ্বারোহী বাহিনী তাদের অফিসারদের হত্যা করবে এবং তারপরে ২৬ নম্বর পাঞ্জাব বাহিনীতে বিদ্রোহ হবে। সেই বিদ্রোহ ক্রমশঃ দিল্লী এবং লাহোরে ছড়িয়ে পড়বে।

 

কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার দারুন এই পরিকল্পনা ব্রিটিশ গোয়েন্দারা জেনে যায় এবং প্রথমসারির সমস্ত নেতারাই ধরা পড়ে। কর্তার  সিং এবং পিংলের ফাঁসি হয়। রাসবিহারী পি.এন টেগোর ছদ্মনামে জাপান যাত্রা করেন। তাঁর এই যাত্রায় অর্থ সাহায্য দিয়েছিলেন যতীনের অনুগামী এবং সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রতিষ্ঠাতা অতীন্দ্র বসু। জাপান যাত্রার আগে রাসবিহারী যাদুগোপালের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু যাদুগোপাল দেখা করেননি। সিঙ্গাপুরে বিদ্রোহ প্রথমদিকে সফল হয়েছিল এবং ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু পরে ইউরোপীয়ান বাহিনী বিদ্রোহীদের নৃশংস ভাবে হত্যা করে দমন করতে সক্ষম হয়।

bottom of page